April 9, 2026, 1:17 am

ইমরান উদ্দিন আহমদ/
দোকানপাট বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৭টা নির্ধারণ করার বিষয়টিতে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন না স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। জ্বালানি সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার লক্ষ্যে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে তারা বাস্তবসম্মত বলেই মনে করছেন। যদিও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সময় বাড়ানোর দাবি ছিল, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নতুন সময়সূচিকে সমর্থন করছেন।
একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছেন দোকান কর্মচারীরাও। আগে রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করতে হলেও এখন তারা তুলনামূলক আগেভাগেই ছুটি পাচ্ছেন। এতে করে পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ বাড়ছে, পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন অনেক কর্মচারী।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরকার সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। এ বাস্তবতায় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ ব্যবসা সচল রাখার জন্য একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনায় একটি শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আগে অনেক দোকান রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবসা শেষ করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও পরিকল্পিতভাবে সময় ব্যবস্থাপনার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারি অফিস বিকেল ৪টায় শেষ হওয়ায় ক্রেতাদের হাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় থাকছে কেনাকাটার জন্য। ফলে বিকেলের সময়টাতে বাজারে ক্রেতা উপস্থিতি বাড়ছে, যা বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষের জন্য এই সময়সীমা সুবিধাজনক বলে মনে করছেন তারা।
কুষ্টিয়া শহরের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, শুরুতে সন্ধ্যা ৬টায় দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তে তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ এতে বিক্রির বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে ৭টা করায় সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। যদিও আরও এক ঘণ্টা বাড়ানো হলে ব্যবসার জন্য ভালো হতো, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, জ্বালানি সংকট শুধু দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। তাই বৃহত্তর স্বার্থে কিছুটা ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের এই উদ্যোগ জ্বালানি সাশ্রয়ে সহায়ক হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কুষ্টিয়া বড়বাজারের এক ভাঙরী দোকান কর্মচারী মো: হারুন-উর রশিদ আসকারী বলেন, “আগে প্রায়ই রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত দোকানে কাজ করতে হতো। এতে বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যেত, পরিবারকে সময় দেওয়াও সম্ভব হতো না। এখন সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ হওয়ায় আমরা আগেভাগেই ছুটি পাচ্ছি, যা আমাদের জন্য অনেক স্বস্তির।”
তিনি বলেন, “যদিও ব্যবসা কিছুটা কমে যাওয়ার শঙ্কা আছে, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছি। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সবাইকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। তবে যদি ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তাহলে সময় আরও বাড়ানো হলে ভালো হয়।”
আরেক কর্মচারী আলমগীর হোসেন ভুইয়া বলেন, “এই সময়সূচির কারণে আমাদের কাজের একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি হয়েছে। আগে কখন ছুটি হবে তা নিশ্চিত ছিল না, এখন অন্তত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসায় ফিরতে পারছি। এতে ব্যক্তিগত জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।”
কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মুরাদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বাস্তবতায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি সময়োপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ। সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দেওয়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিও পুরোপুরি থেমে যাবে না।
তিনি আরও বলেন, কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ীরা শুরু থেকেই দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তকে সহযোগিতা করে আসছেন। যদিও ব্যবসার স্বার্থে রাত ৮টা পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলে আরও ভালো হতো, তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময়সূচি গ্রহণযোগ্য। এতে বাজারে একটি শৃঙ্খলা ফিরে আসছে এবং ব্যবসায়ীরাও পরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন।
মুরাদ চৌধুরী বলেন, “এই সিদ্ধান্তে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, দোকান কর্মচারীরাও উপকৃত হচ্ছেন। তারা আগেভাগেই ছুটি পাচ্ছেন, যা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে সময় আরও বাড়ানো যেতে পারে বলে আমরা আশা করি।”
তিনি জ্বালানি সাশ্রয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার ও ব্যবসায়ীসহ সকল পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।”
আরেক পরিচালক ও একই সঙ্গে কুষ্টিয়া বড়বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফুয়াদ রেজা ফাহিম বলেন, “সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী হিসেবে দেখছি। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিতে ব্যবসা চালু রাখা এবং সাশ্রয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি ছিল। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দেওয়ায় ব্যবসায়ীরা অন্তত ন্যূনতম বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন, যা আমাদের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শুরুতে সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধের সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ এতে বিক্রির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা সময় বাড়ানোয় সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। যদিও ব্যবসার স্বার্থে রাত ৮টা পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলে আরও ভালো হতো, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সরকারের পাশে থেকে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছি।
ফুয়াদ রেজা ফাহিম আরও বলেন, “এই সিদ্ধান্তে শুধু ব্যবসায়ী নয়, দোকানের কর্মচারীরাও উপকৃত হচ্ছেন। তারা আগেভাগেই ছুটি পাচ্ছেন, ফলে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসা শেষ করার কারণে বাজারে একটি শৃঙ্খলাও ফিরে আসছে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ব্যবসায়ী সমাজ দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি পুরোপুরি থামিয়ে না দিয়ে একটি ভারসাম্য তৈরি করেছে। একদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আসবে, অন্যদিকে বাজার কার্যক্রমও সচল থাকবে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।